যে ৫ রোগের চিকিৎসায় বিদেশমুখী বাংলাদেশিরা

বিদেশমুখী রোগীর ঢল: দেশের চিকিৎসায় আস্থা ফিরছে না কেন?
বাংলাদেশে প্রতিবছর কয়েক লাখ রোগী উন্নত চিকিৎসার খোঁজে বিদেশে যাচ্ছেন। বিশেষ করে কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপন, ক্যানসার, হৃদরোগ ও বন্ধ্যত্বের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীরা দেশের চিকিৎসা সেবা নিয়ে আস্থা রাখতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়ে রোগীরা প্রতিবছর ব্যয় করছেন পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি—যা টাকার অঙ্কে দাঁড়ায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার কোটি।

বিদেশমুখীতার প্রধান কারণ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরের পর বছর দেশের চিকিৎসা অবকাঠামো প্রসারিত হলেও গুণগত সেবা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে উন্নতি হয়নি। জটিল চিকিৎসা ব্যবস্থায় আইনি জটিলতা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি ও আত্মবিশ্বাসের অভাবই রোগীদের বিদেশমুখী করছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে প্রাথমিক সেবা অনেকাংশে পাওয়া গেলেও জটিল রোগে তা যথেষ্ট নয়।

ভারতের ভিসা বন্ধ, নতুন গন্তব্য চীন
২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিদেশগামী রোগীদের ৮০ শতাংশই যেতেন ভারতে। তবে বিপ্লব-উত্তর সময়ে মেডিকেল ভিসা জটিলতায় ভারতগামী রোগীর পথ বন্ধ হয়ে যায়। এখন অনেকেই চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে। সম্প্রতি নতুন গন্তব্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে চীনের কুনমিং। দেশটির সরকার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি রোগীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। মার্চ থেকে প্রতি মাসে ৪০-৫০ জন বাংলাদেশি সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

আস্থাহীনতার কাহিনি
কিডনি বিকল হওয়া মোক্তার হোসেন দেশে ডোনার পেলেও আইনি জটিলতায় অস্ত্রোপচার সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত গত বছর ভারতে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করাতে হয় তাকে। একইভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী জাহিদ শেখ মলদ্বারের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে রোবটিক সার্জারির প্রয়োজন পড়লেও দেশে সেই সুবিধা না থাকায় বাধ্য হয়ে ভারতে চিকিৎসা নেন। খরচ হয় ৩৬ লাখ টাকা।

অপচিকিৎসা আর সময় না দেওয়ার অভিযোগও রোগীদের মধ্যে অনাস্থা বাড়াচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, অযথা ইনজেকশন প্রয়োগের কারণে অঙ্গহানি ও মৃত্যুর শিকার হয়েছে শিশু তানভীর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৮১ শতাংশ রোগী মনে করেন চিকিৎসকরা যথাযথ সেবা দেন না, ৮৯ শতাংশ রোগীর অভিযোগ চিকিৎসকরা পর্যাপ্ত সময় দেন না, আর ৮৪ শতাংশের দৃষ্টিতে চিকিৎসকদের প্রতি সামগ্রিক ধারণা নেতিবাচক।

হাসপাতাল মালিকদের অভিযোগ
ল্যাবএইড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএম শামীমের মতে, বাংলাদেশ ক্যানসার ও হৃদরোগ চিকিৎসায় যথেষ্ট উন্নত হলেও সমস্যাটা হলো আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি। তিনি বলেন, আগে এমপি-মন্ত্রীরাও দেশের বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেন। এখন অনেকেই চিকিৎসার পাশাপাশি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাচ্ছেন। তবে কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপনে আইনি জটিলতা বড় প্রতিবন্ধক।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, পোশাক শিল্পের মতো স্বাস্থ্য খাত কোনো প্রণোদনা পায় না। উল্টো নানা নিয়ন্ত্রক জটিলতার কারণে বড় বিনিয়োগে অনীহা তৈরি হয়েছে।

সংস্কার কমিশনের সুপারিশ
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন বলছে, বিদেশমুখিতা কমাতে হলে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যন্ত্রপাতি আমদানিতে শূন্য শুল্ক, কর ছাড় এবং আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে ঠিক যেমনটি গার্মেন্টস খাত পায়। কিন্তু কমিশনের সুপারিশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, এককভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ ছাড়া রেমিট্যান্স, পোশাক শিল্প কিংবা ওষুধ খাতের অর্জিত অর্থ বিদেশে চলে যাবে।

সরকারের অবস্থান
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান জানিয়েছেন, বিদেশমুখী প্রবণতা রোধে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কেবল যন্ত্রপাতি নয়, দক্ষ জনবল তৈরি করাও জরুরি। তিনি বলেন, “যেখানে ঘাটতি আছে, সেখানে হাত দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনাও চলছে।”

সমাধানের পথ কোথায়?
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদের মতে, বিদেশমুখিতা দীর্ঘদিনের সঙ্কট ও আস্থাহীনতার ফল। তাই রাতারাতি এর সমাধান সম্ভব নয়। সরকারের পক্ষ থেকে দূরদর্শী পরিকল্পনা ছাড়া এ প্রবণতা কমানো কঠিন।