পরিবার পরিকল্পনায় বাংলাদেশে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পুরুষদের অংশগ্রহণ এখনো হতাশাজনক। গত ৫০ বছরে পুরুষের জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার মাত্র ৮ শতাংশ বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যার প্রায় পুরোটাই কনডম-নির্ভর। এর বিপরীতে, এখনো ৯১ শতাংশ পুরুষ কোনো ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেন না।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ ২৬ সেপ্টেম্বর দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব জন্মনিরোধ দিবস, যার স্লোগান—‘পরিকল্পিত পরিবার, সুস্থ সমাজ’। সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালে যেখানে মাত্র ৮ শতাংশ দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করতেন, বর্তমানে সেই হার বেড়ে হয়েছে ৬৪ শতাংশ। তবে এই সাফল্যের সিংহভাগ কৃতিত্ব নারীর।
পুরুষের অংশগ্রহণ: ৫০ বছরে মাত্র ১ শতাংশ স্থায়ী পদ্ধতি
বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস) অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে মাত্র ০.৭ শতাংশ পুরুষ কনডম ব্যবহার করতেন। সর্বশেষ ২০২২-২৩ সালের জরিপে পুরুষের জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৭ শতাংশ কনডম এবং মাত্র ২ শতাংশ পুরুষ স্থায়ী পদ্ধতি এনএসভি (ছুরিবিহীন ভ্যাসেকটমি) ব্যবহার করেন। অর্থাৎ, ৫০ বছরে পুরুষদের মধ্যে স্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহারের হার বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরুষদের মধ্যে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে এখনো ব্যাপক ভুল ধারণা রয়েছে। কনডম ও এনএসভি-এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না থাকা সত্ত্বেও অনেক পুরুষ মনে করেন, এতে শারীরিক ক্ষমতা হ্রাস বা স্বাস্থ্যহানি হয়।
নারীর অভিজ্ঞতা: ঝুঁকি নিয়ে একার লড়াই
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার মরিয়ম আক্তার (২৬) এবং অন্যান্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, গর্ভনিরোধ ব্যবস্থায় নারীর একক দায়ভার এখনো দেশের বাস্তবতা। মরিয়ম আক্তার জানান, ১৬ বছর বয়সে বিয়ে এবং প্রথম সন্তানের পর খুব দ্রুতই আবার গর্ভবতী হন, যা গর্ভপাত হয়। এরপর স্বামীর সহযোগিতা না পাওয়ায় তিনি একাই ঝুঁকি নিয়ে ইনজেকশন ও পিল গ্রহণ করেছেন। তাঁর ভাষায়, হাসপাতালে যেতে চেয়েছিলাম, স্বামী যেতে দেননি। নিজের তাগিদে ইনজেকশন নিয়েছি, পিল খেয়েছি।
একই চিত্র দেখা যায় কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর গ্রামের লাকি রানী (৩৩) ও বিলকিস বেগমের (৩৭) ক্ষেত্রেও। পিল খাওয়ায় অনিয়ম এবং সরবরাহ না থাকার কারণে তাঁরা দুজনেই অনিচ্ছাকৃতভাবে গর্ভধারণ করেন, যার ফলস্বরূপ একজন গর্ভপাতের শিকার হন। এটি প্রমাণ করে, পদ্ধতি গ্রহণের একক দায়িত্ব নারীর কাঁধে থাকায় তা প্রায়শই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
পদ্ধতি ব্যবহারে বড়ির প্রাধান্য, পুরুষের বন্ধ্যকরণ মাত্র ১ শতাংশ
বিডিএইচএস ২০২২-২৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মধ্যে খাওয়ার বড়ির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি (২৭ শতাংশ)। এরপর রয়েছে ইনজেকশন (১১ শতাংশ), কনডম (৮ শতাংশ) এবং নারী বন্ধ্যাকরণ (৫ শতাংশ)। এর বিপরীতে পুরুষ বন্ধ্যাকরণ মাত্র ১ শতাংশে সীমাবদ্ধ।
মেরী স্টোপস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কিশওয়ার ইমদাদ জোর দিয়ে বলেন, জন্ম নিয়ন্ত্রণ কেবল একটি স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, এটি নারীর অধিকার, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ গঠনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তিনি জানান, প্রায় ১০ শতাংশ প্রজনন বয়সী দম্পতির মধ্যে এখনো অপূর্ণ চাহিদা বিদ্যমান, অর্থাৎ তাঁরা সন্তান না চাইলেও পদ্ধতি ব্যবহার করছেন না।
মেরী স্টোপস বাংলাদেশের পার্টনারশিপ অ্যান্ড ফান্ডরাইজিং প্রধান মনজুন নাহার মনে করেন, বাঙালি সমাজে জন্ম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব এখনো অনেকাংশে নারীর কাঁধে। তিনি বলেন, জন্ম নিয়ন্ত্রণ একটি যৌথ দায়িত্ব, যা স্বামী-স্ত্রী দুজনের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই হতে পারে না।
তরুণ প্রজন্ম ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততার আহ্বান
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ক্লিনিক্যাল কন্ট্রাসেপশন সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রোগ্রামের (সিসিএসডিপি) লাইন ডিরেক্টর ডা. রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম এগোলেও তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। সঠিক তথ্য ও পরামর্শের অভাবে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ বাড়ছে, যা মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করছে।
ডা. তালুকদারের মতে, এক্ষেত্রে স্থানীয় ধর্মীয় নেতা, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সেবাগ্রহীতা পরিবারগুলোকে সচেতনতার কাজে যুক্ত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, নারী যখন স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণ করেন, তখন পেট কেটে অস্ত্রোপচার করতে হয়। অন্যদিকে, পুরুষের স্থায়ী পদ্ধতি এনএসভি গ্রহণ অনেক সহজ। পুরুষত্ব হারানোর ভ্রান্ত ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে পারলে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির কার্যকারিতা ও সমাজের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব।
