শিশুর মুটিয়ে যাওয়ার কারণ, নিয়ন্ত্রণের উপায়

শিশুর মুটিয়ে যাওয়ার কারণ, নিয়ন্ত্রণের উপায়

শিশুর মুটিয়ে যাওয়া
শিশুদের স্থূলতা বলতে এমন একটি অবস্থাকে বোঝায়, যখন কোনো শিশুর ওজন তার বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে। BMI (বডি মাস ইনডেক্স) একটি উপায়, যার মাধ্যমে বোঝা যায় কোনো শিশু স্বাভাবিক, কম ওজনের, বেশি ওজনের না কি স্থূলতায় আক্রান্ত। শিশুর উচ্চতা ও ওজন বিবেচনায় নিয়ে BMI নির্ধারণ করা হয়। যদি কোনো শিশুর BMI একই বয়স ও লিঙ্গের অন্যান্য শিশুর তুলনায় ৯৫ শতাংশ পারসেন্টাইল বা তার বেশি হয়, তাহলে তাকে স্থূল হিসেবে ধরা হয়।

শিশুকালে স্থূলতা পরবর্তী জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এটি প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও স্থূলতা বহন করে আনার সম্ভাবনা তৈরি করে।

শৈশবে স্থূলতা শিশুর আত্মসম্মানবোধ হ্রাস, বিষণ্নতা এবং উদ্বেগের মতো মানসিক সমস্যার কারণ হতে পারে। এটি শিশুর মধ্যে সময়ের আগেই বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছানোর আশঙ্কাও বাড়িয়ে দেয়।

দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের স্থূলতা নানা শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, এটি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, হাঁপানি, নাক ডেকে ঘুমানো, স্লিপ অ্যাপনিয়া (ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাসে বিরতি), অ্যালকোহলবিহীন ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD), অস্থি ও জয়েন্টের ব্যথা এবং কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

শিশুর স্থূলতার কারণ
শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশের চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম না করার ফলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি জমে যায়। এই অতিরিক্ত, অপ্রয়োজনীয় ক্যালোরি যখন শরীরে বার্ন হয় না, তখন তা চর্বি আকারে জমতে শুরু করে। দীর্ঘদিন যদি শিশুর খাদ্যাভ্যাসে মাত্রাতিরিক্ত খাওয়া এবং খুব কম শারীরিক কার্যক্রম চালু থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে স্থূলতা তৈরি হতে পারে।

বর্তমান সময়ে শিশুদের মধ্যে বাইরের খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপের জায়গা দখল করে নিচ্ছে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গ্যাজেট — যেমন: স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, টেলিভিশন ইত্যাদি। এই প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহারের সময় অনেক শিশু খাবার খেতে খেতে স্ক্রিনে মগ্ন থাকে, যার ফলে শরীরে আরও বেশি ক্যালোরি জমে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালোরি গ্রহণ এবং কম শারীরিক কার্যকলাপ — এই দুটি মিলেই শিশুদের স্থূলতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত।

এর বাইরে আরও নানা বিষয় শিশুর স্থূলতায় ভূমিকা রাখে। পরিবারের মধ্যে স্থূলতার ইতিহাস থাকলে, সেই শিশুরও স্থূলতা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, খাদ্যাভ্যাস যদি অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাস্থ্যকর হয়, তাহলে তা স্থূলতার কারণ হতে পারে।

অস্বাস্থ্যকর খাদ্য বলতে বোঝায়— অতিরিক্ত চিনি ও চর্বি-যুক্ত এবং পুষ্টিহীন খাবার, যেমন: ফাস্ট ফুড, চিপস, পিজ্জা, বার্গার, ক্যান্ডি, চকলেট, ক্যান বা ফ্রোজেন খাবার, বেক করা আইটেম, কুকিজ ও সফট ড্রিংক।

এর পাশাপাশি, কিছু শারীরিক রোগও শিশুদের স্থূলতার জন্য দায়ী হতে পারে। যেমন:

হাইপোথাইরয়েডিজম: এটি এমন এক সমস্যা যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনীয় পরিমাণ হরমোন তৈরি করতে পারে না, ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া কমে যায় এবং ওজন বেড়ে যেতে পারে।

কুশিং’স সিনড্রোম: শরীরে কর্টিসল হরমোন অতিরিক্ত মাত্রায় থাকলে এই অসুখ দেখা দেয়, যা ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।

মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা যেমন উদ্বেগ, চাপ বা বিষণ্নতাও অনেক সময় অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়ে স্থূলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
অবশেষে, কিছু ওষুধ যেমন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ গ্রহণও শিশুদের স্থূলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

শিশুর স্থুলতা নিয়ন্ত্রণে হোমিওপ্যাথি
শিশুদের স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা যথেষ্ট কার্যকর হতে পারে, তবে এটি শুধু ওষুধ দিয়ে সম্ভব নয় — এর সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও শারীরিক পরিশ্রম বাড়ানোর প্রয়োজন হয়। হোমিওপ্যাথিক ওষুধ শরীরের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) বাড়াতে সাহায্য করে, ফলে জমে থাকা চর্বি কমে যেতে পারে।

তবে একটি কথা মনে রাখা জরুরি — হোমিওপ্যাথিতে স্থূলতার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই যা সবার জন্য প্রযোজ্য। প্রতিটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক গঠন অনুযায়ী পৃথক ওষুধ নির্বাচন করা হয়। এই শারীরিক ও মানসিক গঠনকে একত্রে ‘কনস্টিটিউশন’ বলা হয়। একজন অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক শিশুর কনস্টিটিউশন বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত ওষুধ নির্বাচন করেন।

নির্দেশিকা- সবচেয়ে ভালো বিষয় হলো— হোমিওপ্যাথিক ওষুধগুলো প্রাকৃতিক, নিরাপদ এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন। তবে এসব ওষুধ কখনোই নিজে নিজে গ্রহণ করা উচিত নয়। অবশ্যই প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়া উচিত।