ত্বকে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ
ত্বকের সবচেয়ে সাধারণ ভাইরাসজনিত সংক্রমণের মধ্যে রয়েছে হার্পিস সিম্পলেক্স সংক্রমণ, আঁচিল (warts) এবং বসন্ত, হাম, রুবেলার মতো উগ্র জ্বরসমূহ।
হার্পিস সিম্পলেক্স
হার্পিস সিম্পলেক্স হলো একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যা শরীরের যেকোনো অংশে হতে পারে। তবে মুখ, মুখমণ্ডল, যৌনাঙ্গ এবং মলদ্বার অঞ্চলে এটি বেশি দেখা যায়। হার্পিস সিম্পলেক্স দুই ধরনের হয় — টাইপ ১ এবং টাইপ ২।
টাইপ-১: এটি মুখের হার্পিস, যা মূলত মুখ এবং মুখমণ্ডলে আক্রমণ করে। এটি সংক্রামিত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
টাইপ-২: এটি একটি যৌনবাহিত সংক্রমণ, যা মূলত যৌনাঙ্গ এবং মলদ্বার অঞ্চলকে আক্রান্ত করে। সংক্রমণের ফলে মুখ, মুখমণ্ডল, যৌনাঙ্গ ও মলদ্বার অঞ্চলে ঘা দেখা দেয়। সাধারণত জ্বর ও শরীরব্যথার মতো উপসর্গও থাকে। কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ চোখেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, ফলে চোখে ব্যথা, রস নির্গমন এবং অস্বস্তি (“চোখে কাঁকরার মতো অনুভূতি”) দেখা দেয়।
হার্পিস সিম্পলেক্সের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা:
ন্যাট্রাম মিউর (Natrum Mur): যখন জ্বরের সময় ত্বকে ফোস্কার মতো ফুঁসে ওঠা ঘা হয়, যা তরল ভর্তি থাকে এবং পরে ফেটে গিয়ে পাতলা খোসা পড়ে যায়। এই ঘাগুলি মুখের চারপাশ, বাহু ও উরুতে দেখা দিতে পারে।
রাস টক্স (Rhus Tox): যখন হার্পিস সংক্রমণের সঙ্গে তীব্র চুলকানি ও পোড়ার অনুভূতি থাকে। চুলকানোর ইচ্ছে থাকলেও চুলকালে আরাম হয় না। ঘাগুলিতে হলুদ-জলের মতো তরল থাকতে পারে।
পেট্রোলিয়াম (Petroleum): হার্পিস সংক্রমণে যখন তীব্র চুলকানি এবং ঘাগুলি পরে আলসারে পরিণত হয়, তখন এটি ব্যবহার করা হয়। ঘাগুলি বুকে, গলায় এবং হাঁটুর কাছে থাকতে পারে।
উগ্র জ্বরসমূহ (Eruptive Fevers)
উগ্র জ্বর হলো ভাইরাসজনিত জ্বর, যেখানে সাধারণ উপসর্গের পাশাপাশি স্বতন্ত্র ধরণের চর্মরোগ (র্যাশ) দেখা দেয়। বসন্ত, হাম এবং রুবেলা এর অন্তর্ভুক্ত।
বসন্ত (Chickenpox)
ভেরিসেলা-জোস্টার ভাইরাস (VZV) দ্বারা বসন্ত রোগ হয়। এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা মূলত শিশুদের মধ্যে দেখা যায়, তবে প্রাপ্তবয়স্করাও এতে আক্রান্ত হতে পারে।
এটি সংক্রামিত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি, লালা এবং ঘা থেকে নিঃসৃত তরলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
উপসর্গ:
শিশুদের মধ্যে সাধারণত উপসর্গগুলো মৃদু হয়, তবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে তা বেশি তীব্র হয়ে দেখা দেয়।
বসন্তের লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:
#জ্বর, শরীরব্যথা ইত্যাদির সঙ্গে একটি বিশেষ ধরনের র্যাশ।
#শুরুতে ঘাগুলি শরীরের ট্রাঙ্ক (বুক-পেটের অংশ) এবং মুখে ঘনভাবে দেখা দেয়।
#পরে এই ঘাগুলি হাত-পা ও অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
#ঘাগুলি লালচে, তরলভর্তি ফোস্কার মতো হয় এবং উপরে একটি পাতলা খোসা থাকে।
প্রতিবার নতুন ঘা ওঠার সময় শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে।
বসন্তের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা:
অ্যান্টিম ক্রুড (Antim Crud): যখন ঘাগুলি ফুঁসে পুঁজভর্তি হয় এবং চুলকানির সঙ্গে ব্যথা থাকে। ঘষাঘষিতে ঘা থেকে হলদে-সবুজ রঙের তরল বের হতে পারে এবং পরে ঘন খোসা পড়ে। রোগী দুর্বলতা অনুভব করে।
অ্যান্টিম টার্ট (Antim Tart): যখন শরীর জুড়ে লালচে ফোস্কা জাতীয় ঘাগুলি হয়, যেগুলি ব্যথাযুক্ত ও পুঁজভর্তি হয় এবং পরে শুকিয়ে বাদামি খোসায় পরিণত হয়। এই সময় জ্বরও থাকতে পারে।
শিঙ্গেলস (Shingles)
হার্পিস জোস্টার বা শিঙ্গেলস হলো একটি সাধারণ ত্বকের রোগ, যা ভেরিসেলা-জোস্টার ভাইরাস (VZV) দ্বারা সৃষ্টি হয়।
কিছু ক্ষেত্রে, ভাইরাসটি শরীরের স্নায়ুতে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে ভাইরাসটি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং স্নায়ুতে সংক্রমণ সৃষ্টি করে।
এর ফলে ত্বকে ব্যথাযুক্ত ঘা হয় এবং এটি প্রাপ্তবয়স্ক ও বৃদ্ধদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
উপসর্গ:
# সংক্রমিত স্নায়ুর বরাবর র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
#র্যাশ সাধারণত সরু ব্যান্ড বা স্ট্রিপ আকৃতির হয়।
#রোগের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে র্যাশগুলি তরলভর্তি ফোস্কায় পরিণত হয়।
#ফোস্কার সঙ্গে ব্যথা ও চুলকানি থাকে, পরে সেখানে খোসা পড়ে যায়।
#সাধারণত ১৫-৩০ দিনের মধ্যে ঘাগুলি সেরে যায়, তবে ব্যথা আরও দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে।
শিঙ্গেলসের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা:
রেনানকিউলাস বাল্ব (Ranunculus bulb): যখন ফোস্কাগুলি নীলচে-কালো রঙের হয়, তরলে পূর্ণ থাকে এবং তীব্র পোড়ার অনুভূতি ও চুলকানি সৃষ্টি করে। ফেটে গেলে শক্ত খোসা পড়ে যায়।
মেজেরিয়াম (Mezereum): তীব্র স্নায়ুবিষয়ক ব্যথা এবং চুলকানিযুক্ত শিঙ্গেলসের জন্য ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ছোঁয়ার সাথে ব্যথা বেড়ে যায়। ফোস্কাগুলি জ্বলতে পারে এবং বাদামি খোসা তৈরি করে যা ধীরে ধীরে ভালো হয়।
ক্লেমাটিস (Clematis): দীর্ঘদিন ধরে চলা হার্পিস জোস্টারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ফুসকুড়ি লালচে রঙের হয় এবং তীব্র চুলকানির সঙ্গে থাকে, বিশেষ করে ধোয়ার পর চুলকানি বেড়ে যায়।
সাবধান- ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া একা একা দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাবেন না। এতে ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে। যে কোনো প্রয়োজনে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন ০১৭১০০৫০২০০