বর্তমান সময়ে সমাজে যৌনবাহিত রোগের ছড়াছড়ি। এর জন্য অনিরাপদ যৌনতাকে দায়ী করা হয়। যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হলে কষ্টের শেষ থাকে না। যৌনবাহিত রোগ হলো এমন রোগ যা যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে একজন মানুষ থেকে আরেকজনের শরীরে সংক্রমিত হয়। এগুলোকে যৌন সংক্রমণ (STIs) ও বলা হয়। বেশিরভাগ যৌনবাহিত রোগ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক এবং পরজীবীর মাধ্যমে ছড়ায়। ছড়ানোর পর এর ভয়াবহতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে।
যৌনবাহিত রোগের ধরণ:
১. এইচআইভি/এইডস (HIV/AIDS):
কারণ: মানব ইমিউনোডেফিশিয়েন্সি ভাইরাস (HIV)।
কীভাবে ছড়ায়: অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক, আক্রান্ত রক্তের মাধ্যমে, মায়ের থেকে শিশুর কাছে (গর্ভাবস্থা বা দুধপানকালীন)।
লক্ষণ: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়া, ওজন হ্রাস, দীর্ঘমেয়াদী জ্বর, ডায়রিয়া, এবং সংক্রমণ।
২. গনোরিয়া (Gonorrhea):
কারণ: ব্যাকটেরিয়া Neisseria gonorrhoeae।
কীভাবে ছড়ায়: যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে।
লক্ষণ: পুরুষের ক্ষেত্রে প্রস্রাবে ব্যথা এবং পুরুষাঙ্গ থেকে সাদা বা হলুদ স্রাব। মহিলাদের ক্ষেত্রে যোনিতে স্রাব, প্রস্রাবে ব্যথা এবং তলপেটে ব্যথা।
৩. সিফিলিস (Syphilis):
কারণ: ব্যাকটেরিয়া Treponema pallidum।
কীভাবে ছড়ায়: যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে বা ক্ষতর মাধ্যমে।
লক্ষণ: প্রাথমিক পর্যায়ে গোপনাঙ্গে বা মুখে পেইনলেস ঘা। পরবর্তী পর্যায়ে ত্বকের র্যাশ, জ্বর, মাথাব্যথা ইত্যাদি।
৪. ক্লামাইডিয়া (Chlamydia):
কারণ: ব্যাকটেরিয়া Chlamydia trachomatis।
কীভাবে ছড়ায়: যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে।
লক্ষণ: প্রস্রাবে ব্যথা, যোনি বা পুরুষাঙ্গ থেকে স্রাব। অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণ প্রকাশ পায় না।
৫. হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV):
কারণ: ভাইরাস HPV।
কীভাবে ছড়ায়: যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে বা ত্বকের সংস্পর্শে।
লক্ষণ: যৌনাঙ্গে বা মুখে ওয়ার্টস (আঁচিল)। কিছু ক্ষেত্রে এই ভাইরাস থেকে সার্ভিক্যাল ক্যান্সারও হতে পারে।
৬. জেনিটাল হার্পিস (Genital Herpes):
কারণ: Herpes Simplex Virus (HSV)।
কীভাবে ছড়ায়: যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে বা ত্বকের সংস্পর্শে।
লক্ষণ: যৌনাঙ্গে বা মুখে ফোস্কা বা ক্ষত, যা ব্যথা হতে পারে।
৭. ট্রাইকোমোনিয়াসিস (Trichomoniasis):
কারণ: পরজীবী Trichomonas vaginalis।
কীভাবে ছড়ায়: যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে।
লক্ষণ: যোনিতে বা পুরুষাঙ্গে চুলকানি, জ্বালাপোড়া, স্রাব এবং প্রস্রাবে ব্যথা।
৮. হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B):
কারণ: Hepatitis B virus (HBV)।
কীভাবে ছড়ায়: যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে, রক্তের মাধ্যমে, বা মায়ের থেকে শিশুর কাছে।
লক্ষণ: জন্ডিস, বমি, ক্লান্তি এবং লিভারের ক্ষতি।
৯. শ্রঙ্ক্রমনজ্বর (Chancroid):
কারণ: ব্যাকটেরিয়া Haemophilus ducreyi।
কীভাবে ছড়ায়: যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে।
লক্ষণ: যৌনাঙ্গে পেইনফুল ঘা।
১০. পিউবিক লাউস (Pubic Lice):
কারণ: পরজীবী Pthirus pubis।
কীভাবে ছড়ায়: যৌন সম্পর্ক বা সংক্রমিত কাপড়ের মাধ্যমে।
লক্ষণ: যৌনাঙ্গে বা শরীরের অন্যান্য স্থানে চুলকানি।
যৌনবাহিত রোগের কারণ:
অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক: যৌন সম্পর্কের সময় কন্ডোম বা অন্যান্য প্রতিরোধমূলক পদ্ধতি ব্যবহার না করা।
বহু যৌনসঙ্গী থাকা: একজনের চেয়ে বেশি সঙ্গীর সঙ্গে অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
প্রতিরোধমূলক টিকা গ্রহণ না করা: HPV বা হেপাটাইটিস বি-এর মতো কিছু রোগের বিরুদ্ধে টিকা রয়েছে, যা গ্রহণ না করলে ঝুঁকি বাড়ে।
দূষিত রক্ত: সংক্রামিত রক্ত গ্রহণের মাধ্যমে রোগ ছড়াতে পারে।
মায়ের থেকে শিশুর মধ্যে: সংক্রমিত মায়ের থেকে শিশুর মধ্যে জন্মের সময় বা স্তন্যদানের মাধ্যমে সংক্রমণ হতে পারে।
যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধ:
কন্ডোম ব্যবহার করা: যৌন সম্পর্কের সময় কন্ডোম ব্যবহার করলে অনেক যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি কমে যায়।
টিকা নেওয়া: HPV এবং হেপাটাইটিস বি-এর মতো রোগের প্রতিরোধমূলক টিকা গ্রহণ করা।
সচেতনতা বৃদ্ধি: যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।
যৌনসঙ্গী নির্বাচনে সতর্ক থাকা: যৌনসঙ্গী সম্পর্কে জানাশোনা থাকা এবং পরীক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: যৌনবাহিত রোগের জন্য নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং পরীক্ষা করা।