খাদ্যের অ্যালার্জি কী? কারণ, লক্ষণ ও এর চিকিৎসা কী?

কখনো শুনেছেন সামান্য চিনাবাদাম খেয়েও কারো জীবনঘাতী অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া হচ্ছে? অথবা রান্না করা মাশরুমের এক চামচ খেয়েই কেউ অ্যাজমার তীব্র আক্রমণে ভুগছেন? কিংবা কালো গোলমরিচ থেকে মাইগ্রেনের তীব্রতা বাড়ছে? শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, এই ঘটনাগুলো কিন্তু সত্যি।

খাদ্য অ্যালার্জি কী এবং কীভাবে আক্রান্ত হয়?
খাদ্য অ্যালার্জি (Food Allergy) হলো কোনো নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার ঠিক পরেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি প্রতিক্রিয়া। যখন কারো খাদ্যের অ্যালার্জি থাকে, তখন তার ইমিউন সিস্টেম সেই খাবারের মধ্যে থাকা একটি নির্দিষ্ট প্রোটিনের প্রতি অতি সংবেদনশীলতা দেখায়। খুব সামান্য পরিমাণে সেই খাবারও শরীরে উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে, যেমন অ্যানাফাইল্যাক্সিস—যা সম্ভাব্য প্রাণঘাতী।

অ্যানাফাইল্যাক্সিস হলো এমন একটি গুরুতর প্রতিক্রিয়া যা শ্বাসনালীকে সংকুচিত করে শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা দিতে পারে এবং শরীরকে শকে পাঠিয়ে দিতে পারে। এই প্রতিক্রিয়ায় একই সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন অংশ (যেমন: পেটে ব্যথা এবং তার সঙ্গে ত্বকে র্যাশ) প্রভাবিত হতে পারে।

প্যাটোফিজিওলজি (Pathophysiology):

আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা খাদ্যের অ্যালার্জি মোকাবিলার জন্য দুটি উপাদান ব্যবহার করে:

ইমিউনোগ্লোবুলিন ই (IgE): এটি এক প্রকার অ্যান্টিবডি, যা রক্তে চলাচলকারী প্রোটিন।

মাস কোষ (Mast Cells): এই কোষগুলো শরীরের সব টিস্যুতে পাওয়া যায়, তবে হজম ট্র্যাক্ট, নাক, গলা এবং ফুসফুসে বিশেষভাবে বেশি থাকে।

প্রথমবার যখন আপনি অ্যালার্জেনযুক্ত খাবার খান, তখন কোষগুলো এই অ্যালার্জেনের বিরুদ্ধে প্রচুর IgE তৈরি করে। এই IgE মাস কোষের পৃষ্ঠে যুক্ত হয়। পরবর্তীতে, যখন আপনি অ্যালার্জেনযুক্ত খাবারটি পুনরায় খান, তখন সেই অ্যালার্জেন IgE-এর সঙ্গে বিক্রিয়া করে এবং মাস কোষগুলো থেকে হিস্টামিন ও অন্যান্য পদার্থ নির্গত করে। এই পদার্থগুলোই টিস্যুভেদে বিভিন্ন উপসর্গ তৈরি করে।

খাদ্য অ্যালার্জি বনাম খাদ্য অসহিষ্ণুতা
অনেকেই ‘খাদ্য অ্যালার্জি’ এবং ‘খাদ্য অসহিষ্ণুতা’ (Food Intolerance) শব্দ দুটিকে এক মনে করেন, কিন্তু তারা এক নয়।

বৈশিষ্ট্য——– খাদ্য অ্যালার্জি (Food Allergy)———————— খাদ্য অসহিষ্ণুতা (Food Intolerance)
সংশ্লিষ্টতা——- রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Immune System) জড়িত।—— রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জড়িত নয়।
কারণ———– খাবারের প্রোটিনের প্রতি অতি-প্রতিক্রিয়া।—————-এনজাইমের ঘাটতি বা হজমের সমস্যা।
উদাহরণ———-চিনাবাদাম, দুধ, ডিমের অ্যালার্জি।———— ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা (দুধের শর্করা হজমকারী এনজাইমের অভাব)।
উপসর্গ———– অ্যানাফাইল্যাক্সিসের মতো মারাত্মক হতে পারে।—– গ্যাস, পেট ফাঁপা, পেটে ব্যথার মতো মৃদু উপসর্গ।

সাধারণ খাদ্য অ্যালার্জেনসমূহ
যদিও ফল, সবজি ও মাংসের মতো যেকোনো খাবারেই অ্যালার্জি হতে পারে, তবে তা বিরল। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯০ শতাংশ খাদ্য অ্যালার্জির জন্য দায়ী মাত্র আটটি খাদ্য:

১। দুধ

২। ডিম

৩। চিনাবাদাম

৪। ট্রি নাটস (আখরোট, কাজুবাদাম ইত্যাদি)

৫। মাছ

৬। শেলফিশ

৭। সয়া

৮। গম

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণ অ্যালার্জেন: চিনাবাদাম, ট্রি নাটস, শেলফিশ (চিংড়ি, কাঁকড়া ইত্যাদি)।

শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণ অ্যালার্জেন: ডিম, দুধ, চিনাবাদাম।

খাদ্য অ্যালার্জির প্রকারভেদ
পরাগ খাদ্য অ্যালার্জি সিন্ড্রোম (Pollen Food Allergy Syndrome): একে ওরাল অ্যালার্জি সিন্ড্রোমও বলা হয়। যাদের হে ফিভার (Hay Fever) আছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়। নির্দিষ্ট বাদাম, মশলা, তাজা ফল ও সবজিতে থাকা প্রোটিন পরাগের অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী প্রোটিনের মতো হওয়ায় মুখ চুলকানো বা এমনকি গলা ফোলাও হতে পারে (ক্রস রিঅ্যাকটিভিটি)।

ব্যায়াম-প্ররোচিত খাদ্য অ্যালার্জি সিন্ড্রোম (Exercise-Induced Food Allergy Syndrome): নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার পর শারীরিক উষ্ণতা বাড়লে (ব্যায়ামের পরে) চুলকানি, মূর্ছা যাওয়া, ‘আর্টিকেরিয়া’ (হাইভস) বা অ্যানাফাইল্যাক্সিস হতে পারে। ব্যায়ামের কয়েক ঘণ্টা আগে খাওয়া এড়িয়ে চললে এটি প্রতিরোধ করা যায়।

ফুড প্রোটিন-প্ররোচিত এন্টারোকোলাইটিস সিন্ড্রোম (FPIES): এটি বিলম্বিত খাদ্য অ্যালার্জি নামেও পরিচিত। অ্যালার্জেনযুক্ত খাবার (যেমন দুধ, সয়া, শস্য) খাওয়ার পরে তীব্র বমি ও ডায়রিয়া হয়। এটি সাধারণত শৈশবে, যখন শিশুকে শক্ত খাবার দেওয়া হয়, তখন বিকশিত হয়।

ইওসিনোফিলিক ইসোফেজাইটিস (Eosinophilic Esophagitis): খাদ্যের প্রোটিনের প্রতি অ্যালার্জি বা সংবেদনশীলতার কারণে খাদ্যনালী বা ইসোফেগাসে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। এই ধরনের রোগীদের প্রায়শই হাঁপানি, রাইনাইটিস বা অ্যালার্জির পারিবারিক ইতিহাস থাকে।

খাদ্য অ্যালার্জির লক্ষণ
অ্যালার্জির উপসর্গগুলো ব্যক্তিভেদে আলাদা হয়। এটি হালকা হাঁপানির আক্রমণ থেকে শুরু করে জীবনঘাতী অ্যানাফাইল্যাক্সিস পর্যন্ত হতে পারে।

প্রাথমিক ও হজমজনিত লক্ষণ (কয়েক মিনিটের মধ্যে) রক্তবাহিত ও গুরুতর লক্ষণ
মুখে চুলকানি বা সুরসুরি অনুভব করা। শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস ছোট হয়ে আসা।
বমি, ডায়রিয়া বা পেটে ব্যথা। শোথ (Wheezing) বা শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো শব্দ।
ত্বকে আর্টিকেরিয়া (লালচে ফুসকুড়ি) বা একজিমা। পুনরাবৃত্তিমূলক কাশি বা গলা বসে যাওয়া।
রক্তচাপ কমে যাওয়া। শকের লক্ষণ বা সংবহনতন্ত্রের পতন।
জিহ্বা ফুলে যাওয়া (কথা বলা বা শ্বাস নিতে কষ্ট)। দুর্বল পালস।
ফ্যাকাশে বা নীল ত্বক। মাথা ঘোরা বা মূর্ছা যাওয়া।
সাধারণত, বেশিরভাগ উপসর্গ খাবার খাওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে দেখা যায়, প্রায়শই কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হয়। বিরল ক্ষেত্রে, প্রতিক্রিয়া ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা বা তারও পরে বিলম্বিত হতে পারে (যেমন: একজিমা বা লোন স্টার টিকের কামড়ে লাল মাংসের বিরল অ্যালার্জি)।

ঝুঁকি বাড়ানোর কারণসমূহ
পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারে হাঁপানি, আর্টিকেরিয়া, একজিমা বা হে ফিভারের ইতিহাস থাকলে খাদ্যের অ্যালার্জির ঝুঁকি বাড়ে।

বয়স: খাদ্যের অ্যালার্জি শিশুদের, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হজমতন্ত্র পরিপক্ক হয় এবং অ্যালার্জির প্রভাব কমতে থাকে।

হাঁপানি (Asthma): হাঁপানি ও খাদ্যের অ্যালার্জি প্রায়শই একসাথে ঘটে এবং যখন ঘটে, তখন উভয় উপসর্গের তীব্রতা বেশি হয়।

অন্যান্য অ্যালার্জি: কারো নির্দিষ্ট কোনো অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া (যেমন হে ফিভার) থাকলে তার খাদ্যের অ্যালার্জি হওয়ার ঝুঁকিও বেশি থাকে।

খাদ্য অ্যালার্জির হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
হোমিওপ্যাথি খাদ্যের অ্যালার্জির চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে, কারণ এটি অতি-সংবেদনশীল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অনুকূল করার মাধ্যমে কাজ করে। হোমিওপ্যাথি অ্যালার্জিকে রোগীর আরোগ্য প্রক্রিয়ার একটি অন্তর্নিহিত ভারসাম্যহীনতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখে। অ্যালার্জিকে নিরাময় করার চেয়েও মূল উদ্দেশ্য হলো শরীরের ভেতরের ভারসাম্যকে পুনরুদ্ধার করা।

খাদ্য সংবেদনশীলতা বা অসহিষ্ণুতার চিকিৎসায় নির্দিষ্ট হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ:

Silicea: শিশুদের দুধ অসহিষ্ণুতায়, এমনকি মায়ের দুধ হজম না হলেও ব্যবহার করা হয়।

Zingiber: তরমুজ খাওয়ার পরে ডায়রিয়া হলে।

Antim crudum: ফল খাওয়ার পরে মাথাব্যথা হলে।