হাইড্রোনফ্রোসিস বা কিডনি ফুলে যাওয়ার কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

কিডনি ফুলে যাওয়াকে হাইড্রোনফ্রোসিস বলে। এটি ঘটে যখন কোনো কারণে মূত্র কিডনি থেকে মূত্রাশয়ে সঠিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে না এবং কিডনির ভেতরে জমা হয়। সাধারণত একটি কিডনিতে এ সমস্যা দেখা দিলে পরে উভয় কিডনেই আক্রন্ত হয়। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা হাইড্রোনফ্রোসিসের লক্ষণ উপশম এবং ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে, তবে তা অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথের পরামর্শ অনুযায়ী প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি গ্রহণ করা উচিত।

হাইড্রোনফ্রোসিস কী?
স্বাভাবিক অবস্থায়, কিডনিতে মূত্র তৈরি হয় এবং ইউরেটার (মূত্রনালী) নামক নালীর মাধ্যমে মূত্রথলিতে জমা হয়। পরে ইউরেথ্রা (মূত্রনালী) দিয়ে এটি শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু যদি কোনো কারণে এই স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং মূত্র কিডনিতে আটকে যায় বা ফিরে আসে, তখন কিডনি ফুলে যায়। এই অবস্থাকেই হাইড্রোনফ্রোসিস বলে।

কিডনি মূত্র জমার কারণসমূহ
হাইড্রোনফ্রোসিসের প্রধান কারণ হলো মূত্রনালীর যেকোনো ধরনের বাধা। এই বাধা বিভিন্ন কারণে হতে পারে:

কিডনি পাথর: কিডনিতে পাথর হলে তা মূত্রনালীতে আটকে গিয়ে প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধা দিতে পারে।

দাগ ও রক্ত জমাট বাঁধা: মূত্রনালীর ভেতরে কোনো কারণে দাগ বা রক্ত জমাট বাঁধলে সেটিও বাধার সৃষ্টি করতে পারে।

ইউরেটেরোপেলভিক জংশনে মোচড়: যেখানে ইউরেটার কিডনির পেলভিসের সঙ্গে মিলিত হয়, সেখানে কোনো মোচড় বা বাঁক থাকলেও এই সমস্যা হতে পারে।

প্রোস্টেট গ্রন্থি বৃদ্ধি (BPH): পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট বড় হয়ে গেলে তা মূত্রনালীতে চাপ সৃষ্টি করে এবং প্রস্রাবের প্রবাহ আটকে দিতে পারে।

টিউমার: পেলভিক অঞ্চলে কোনো টিউমার বা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি মূত্রতন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

গর্ভাবস্থা: গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান ভ্রূণের চাপে ইউরেটার সংকুচিত হতে পারে।

আঘাত বা সংক্রমণ: কোনো আঘাত বা সংক্রমণের ফলে মূত্রনালী সরু হয়ে গেলেও হাইড্রোনফ্রোসিস হতে পারে।

ভেসিইউরেটেরাল রিফ্লাক্স: এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে মূত্রথলির পেশীগুলো ঠিকভাবে কাজ করে না, ফলে মূত্র উল্টো দিকে কিডনিতে ফিরে আসে।

জন্মগত ত্রুটি: কিছু শিশু জন্মগতভাবে কিডনি, ইউরেটার বা মূত্রথলির সংযোগস্থলে কাঠামোগত অস্বাভাবিকতা নিয়ে জন্মায়, যা প্রস্রাবের স্বাভাবিক নিষ্কাশনে বাধা দেয়।

স্নায়ু সমস্যা: মূত্রথলির চারপাশের স্নায়ুতে কোনো ধরনের ক্ষতি বা সমস্যা হলেও হাইড্রোনফ্রোসিস হতে পারে।

হাইড্রোনফ্রোসিসের লক্ষণ
অনেক সময় হাইড্রোনফ্রোসিসের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে যখন লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়, তখন এর মধ্যে থাকতে পারে:

(1) ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া এবং প্রস্রাব করার তীব্র তাগিদ।

(2) প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া।

(3) প্রস্রাব অসম্পূর্ণভাবে খালি হয়েছে বলে মনে হওয়া।

(4) পেটের পাশে বা পিঠে ব্যথা যা তলপেট বা কুঁচকিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

(5) বমি বমি ভাব এবং বমি।

(6) জ্বর।

শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে যদি লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে তাদের ভালোভাবে খাবার না খাওয়া, শক্তির অভাব, খিটখিটে মেজাজ, বার বার প্রস্রাবে সংক্রমণ, জ্বর, পেটে ব্যথা বা প্রস্রাবে রক্ত দেখা যেতে পারে।

জটিলতা: হাইড্রোনফ্রোসিস মূত্রনালীর সংক্রমণের (UTI) ঝুঁকি বাড়ায়। যদি সময়মতো ইউটিআই-এর চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে কিডনিতে সংক্রমণ (পাইলোনেফ্রাইটিস) হতে পারে। গুরুতর হাইড্রোনফ্রোসিস থেকে স্থায়ী কিডনির ক্ষতিও হতে পারে।

কিডনিতে প্রস্রাব জমার হোমিওপ্যাথিক প্রতিকার
হোমিওপ্যাথিক প্রতিকারগুলো হাইড্রোনফ্রোসিসের ব্যবস্থাপনায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রতিকারগুলো কিডনির ফোলা কমাতে এবং বিভিন্ন লক্ষণ যেমন ব্যথা, জ্বালাপোড়া, এবং ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়ার সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখতে হবে, এই প্রতিকারগুলো অবশ্যই একজন যোগ্য এবং অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথের পরামর্শ অনুযায়ী প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি গ্রহণ করা উচিত।

আপনার যদি হাইড্রোনফ্রোসিসের কোনো লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

হাইড্রোনফ্রোসিসের জন্য হোমিওপ্যাথিক প্রতিকার
হোমিওপ্যাথি হাইড্রোনফ্রোসিসের লক্ষণ উপশমে এবং কিডনির ফোলা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মূত্রনালীর সংক্রমণের ক্ষেত্রেও এই ওষুধগুলি উপকারী। একজন অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক রোগীর লক্ষণ এবং সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে সঠিক ওষুধ নির্বাচন করেন।

১. সারোথামনাস (Sarothamnus) – কিডনিতে টানটান ব্যথা
এটি সারোথামনাস স্কোপারিয়াস (Scotch Broom) নামক উদ্ভিদ থেকে তৈরি একটি প্রাকৃতিক ওষুধ। কিডনিতে টানটান ব্যথা হলে এটি নির্দেশিত হয়, যার সাথে প্রস্রাবের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। বিশেষত রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব হয়।

২. অ্যাপোসাইনাম (Apocynum) – কিডনিতে নিস্তেজ ব্যথা
এই ওষুধটি মূত্রনালীর অঙ্গগুলির ওপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। কিডনিতে মৃদু, নিস্তেজ ব্যথা থাকলে এটি উপকারী। এর সাথে মূত্রথলি ফুলে যাওয়ার অনুভূতি হয় এবং গরম প্রস্রাব নির্গত হয়। প্রস্রাবে ঘন শ্লেষ্মা থাকতে পারে এবং প্রস্রাবের পর মূত্রনালীতে জ্বালাপোড়া হয়।

৩. এপিস মেলিফিকা (Apis Mellifica) – প্রস্রাবের সাথে ব্যথা
প্রস্রাবের সাথে জ্বালা, হুল ফোটানো বা দংশনের মতো ব্যথা হলে এটি একটি কার্যকর ওষুধ। বিশেষত প্রস্রাবের শেষ ফোঁটায় তীব্র জ্বালাপোড়া হয়। ঘন ঘন, এমনকি প্রতি আধা ঘণ্টা অন্তর প্রস্রাব হয়, কিন্তু পরিমাণ খুব কম থাকে। কখনো কখনো প্রস্রাবে রক্তও দেখা যেতে পারে। কিডনি অঞ্চলে চাপ দিলে বা ঝুঁকে থাকলে ব্যথা বাড়ে।

৪. নাইট্রিক অ্যাসিড (Nitricum Acidum) – ঘন ঘন প্রস্রাব
বিশেষ করে রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব হলে এই ওষুধটি সাহায্য করে। প্রস্রাবের পরিমাণ কম, এবং এতে শ্লেষ্মা, পুঁজ বা রক্ত থাকতে পারে। প্রস্রাব করার সময় পেটে কাঁটা-কাঁটা ব্যথা হতে পারে। প্রস্রাবের পর জ্বালাপোড়া অনুভব হয়। কিডনিতে সংকোচনশীল ব্যথা মূত্রথলি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

৫. আর্সেনিক অ্যালবাম (Arsenicum Album) – প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া
প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া ব্যথা হলে এই ওষুধটি বিবেচনা করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রস্রাবের শুরুতে এই ব্যথা হয়। প্রস্রাব কম এবং কষ্টদায়ক হয়। এটি ঘোলাটে, পুঁজযুক্ত বা রক্তযুক্ত হতে পারে। কিডনি অঞ্চলে সেলাইয়ের মতো ব্যথাও হতে পারে।

৬. ফসফরাস (Phosphorus) – ঘন ঘন এবং জরুরি প্রস্রাব
ঘন ঘন এবং জরুরি প্রস্রাবের তাগিদ থাকলে এটি উপকারী। প্রস্রাব কম, ঘন, ঘোলাটে হতে পারে। কখনো কখনো প্রস্রাব বাদামী রঙের হয়, লাল বালির মতো পলি থাকে এবং দুর্গন্ধযুক্ত হয়। এর সাথে কিডনি অঞ্চলে নিস্তেজ ব্যথা থাকতে পারে।

৭. বারবেরিস ভালগারিস (Berberis Vulgaris) – কিডনি অঞ্চলে ব্যথা
এই ওষুধটি কিডনি অঞ্চলের ব্যথার জন্য নির্দেশিত হয়। ব্যথা চাপা, গুলি করা, ছিঁড়ে যাওয়া, টানটান বা থেঁতলে যাওয়ার মতো হতে পারে। ব্যথা মূত্রথলি বা উরুতে ছড়িয়ে যেতে পারে। ঝুঁকে থাকলে, বসে থাকলে বা শুয়ে থাকলে ব্যথা বাড়ে, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকলে ভালো লাগে। ঘন ঘন প্রস্রাবের তাগিদ থাকে। প্রস্রাবের রঙ ফ্যাকাশে হলুদ, জেলির মতো পলি সহ এবং উষ্ণ। প্রস্রাবের পর মনে হয় যেন প্রস্রাব সম্পূর্ণ হয়নি।

৮. আর্জেন্টাম মেট (Argentum Met) – ঘন ঘন প্রস্রাব
হাইড্রোনেফ্রোসিসের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ। ঘন ঘন প্রস্রাবের সমস্যায় এটি ব্যবহৃত হয়। যাদের এটি প্রয়োজন তাদের মূত্রথলি (সিস্টাইটিস) এবং মূত্রনালীর (ইউরেথ্রাইটিস) প্রদাহও হতে পারে।

৯. সলিডাগো (Solidago) – চাপ দিলে কিডনিতে ব্যথা
কিডনিতে চাপ দিলে ব্যথা হলে এটি খুবই কার্যকর। এই ব্যথা পেট এবং মূত্রথলি পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। এর সাথে অল্প পরিমাণে প্রস্রাব করতে কষ্ট হয়। প্রস্রাবে ঘন পলি এবং টক গন্ধ থাকতে পারে।

১০. ক্যান্থারিস (Cantharis) – সিস্টাইটিস ও ইউটিআই
সিস্টাইটিস এবং মূত্রনালীর সংক্রমণের জন্য এটি একটি শীর্ষস্থানীয় ওষুধ। প্রস্রাবের সময়, আগে বা পরে তীব্র ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হলে এটি ব্যবহার করা হয়। প্রস্রাবের জন্য অবিরাম তাগিদ থাকলেও খুব অল্প পরিমাণে প্রস্রাব হয়।

১১. টেরেবিনথিনা (Terebinthina) – প্রস্রাবে রক্তের সাথে ব্যথা
যখন প্রস্রাবে রক্তের সাথে যন্ত্রণাদায়ক প্রস্রাব হয়, তখন টেরেবিনথিনা খুবই কার্যকর। প্রস্রাবের সময় তীব্র এবং বেদনাদায়ক চাপ থাকে। প্রস্রাব ব্যথার সাথে এবং অল্প পরিমাণে নির্গত হয়। কখনো কখনো ফোঁটা ফোঁটা করে প্রস্রাব হয়। প্রস্রাবের পর মূত্রথলি অসম্পূর্ণ খালি হওয়ার অনুভূতি হয়। এর সাথে কিডনিতে জ্বালাপোড়া এবং টানটান ব্যথা হতে পারে।