সাইনোসাইটিস যেভাবে হয়, কারণ ও রোগ নির্ণয়

সাইনোসাইটিসের প্যাথোফিজিওলজি (রোগপ্রক্রিয়া)
প্যারানাসাল সাইনাস হলো খুলি বা মাথার হাড়ে অবস্থিত চার জোড়া ফাঁপা গহ্বর। এগুলো মুখের গালের হাড়ে (ম্যাক্সিলারি সাইনাস), কপালে (ফ্রন্টাল সাইনাস), নাকের মাঝের হাড়ের পেছনে ও চোখের মাঝখানে (ইথময়েডাল সাইনাস) এবং নাকের ওপরের অংশ ও চোখের পেছনে (স্ফেনয়েডাল সাইনাস) অবস্থান করে।

এই সব সাইনাসের ভেতরের আবরণ একই ধরনের ঝিল্লিযুক্ত, যেটা নাকের ভেতরেও থাকে। এই ঝিল্লি প্রতিনিয়ত শ্লেষ্মা (মিউকাস) উৎপন্ন করে, যা নাকের মাধ্যমে সাইনাস থেকে বেরিয়ে যায়।

কিন্তু যখন কারও সাধারণ ঠান্ডা লাগে বা নাকের অ্যালার্জি হয়, তখন শ্লেষ্মার উৎপাদন বেড়ে যায় এবং সাইনাসের ঝিল্লিতে ফোলাভাব দেখা দেয়। এর ফলে সাইনাস থেকে শ্লেষ্মা বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হয় বা বন্ধ হয়ে যায়। তখন শ্লেষ্মা সাইনাসে আটকে পড়ে, যা জীবাণু (ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস) জন্মাতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে। এর ফলে সাইনাসে সংক্রমণ ঘটে এবং সাইনাসাইটিস তৈরি হয়।

সাইনোসাইটিসের উপসর্গসমূহ
সাইনোসাইটিসে যে লক্ষণ ও উপসর্গগুলো দেখা যায়, তা নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো—

১. নাসারন্ধ্র থেকে নির্গত নিঃসরণ: ঘন ও পুরু ধরনের স্রাব যা হলুদ, সবুজ, পুঁজের মতো বা রক্তমিশ্রিত হতে পারে।

২. পোস্ট-নাসাল ড্রিপিং: শ্লেষ্মা নাক থেকে গলায় পড়ে যাওয়ার অনুভূতি।

৩. মাথাব্যথা, বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর।

৪. মাথা বা মুখে চাপ/ব্যথা, ফোলাভাব বা স্পর্শে ব্যথা — এটি আক্রান্ত সাইনাসের অবস্থান অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে:

ফ্রন্টাল সাইনোসাইটিসে: কপালে ও চোখের ওপরের অংশে ব্যথা অনুভূত হয়।

ম্যাক্সিলারি সাইনোসাইটিসে: গাল, উপরের চোয়াল বা দাঁতে ব্যথা হয়।

ইথময়েডাল সাইনোসাইটিসে: চোখের পেছনে এবং চোখের কোণের (যেখানে উপরের ও নিচের চোখের পাতা মিলিত হয়) আশপাশে চাপ বা ব্যথা অনুভূত হয়।

স্ফেনয়েডাল সাইনোসাইটিসে: চোখের পেছনে ও মাথার পেছনের বা ওপরের অংশে ব্যথা বা চাপ অনুভূত হয়।

৫. নাক বন্ধ থাকা, ফলে নাক দিয়ে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়া।

৬. কানে ভারী ভাব বা ব্যথা, গন্ধ ও স্বাদ কমে যাওয়া, কাশি, গলা পরিষ্কার করার প্রবণতা, ক্লান্তি অনুভব, মুখে দুর্গন্ধ—এই উপসর্গগুলিও দেখা দিতে পারে।

৭. জ্বর—এটি সাধারণত তীব্র (acute) সাইনোসাইটিসে হতে পারে, তবে দীর্ঘস্থায়ী (chronic) সাইনাসাইটিসে খুব একটা দেখা যায় না।

তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী সাইনোসাইটিসে উপসর্গগুলো প্রায় একরকম হলেও মূল পার্থক্য হলো—দীর্ঘস্থায়ী সাইনোসাইটিস তিন মাস বা তার বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়।

সাইনোসাইটিস কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
উপসর্গ অনুযায়ী সাইনোসাইটিসের সন্দেহ হলে কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষা এই রোগ নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। সবচেয়ে সাধারণ ও প্রাথমিকভাবে সুপারিশকৃত পরীক্ষা হলো প্যারানাসাল সাইনাসের এক্স-রে (X-ray PNS)। এটি একটি নন-ইনভেসিভ পরীক্ষা, অর্থাৎ এতে ত্বক বা শরীরের কোনো প্রাকৃতিক ছিদ্রে যন্ত্র প্রবেশ করাতে হয় না। এই ইমেজিং পরীক্ষায় অল্পমাত্রায় রেডিয়েশন ব্যবহার করে প্যারানাসাল সাইনাসের ছবি তোলা হয় এবং সাইনাসাইটিস আছে কি না তা নির্ধারণ করা হয়। তবে এক্স-রে যথেষ্ট বিস্তারিত তথ্য দেয় না এবং সমস্যার মূল কারণও নির্ধারণ করতে পারে না।

এরপর আরও নির্ভরযোগ্য ও বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার জন্য যে পরীক্ষা করা হয়, তা হলো সিটি স্ক্যান (CT Scan – Computed Tomography Scan)। এটি নাক ও প্যারানাসাল সাইনাসের অনেক বিস্তারিত ছবি দেয় এবং সাইনাসের ৩-ডি (থ্রিডি) দৃশ্য তুলে ধরে। সাইনাসাইটিস নিশ্চিত করার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি পরীক্ষামূলক পদ্ধতি।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো নাসাল অ্যান্ডোস্কপি। এই পরীক্ষা একজন ইএনটি (নাক, কান, গলা) বিশেষজ্ঞ করে থাকেন। এতে আলো ও ক্যামেরাযুক্ত একটি সরু নল নাকের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে সরাসরি নাক ও সাইনাসের অভ্যন্তরের অবস্থা পরিষ্কারভাবে দেখা হয়।

এই পরীক্ষাগুলো রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসকদের নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।