অটিজম নিরাময়ের ১০ সূত্র

অটিজম নিরাময়ের ১০ সূত্র

অটিজম নিরাময় বা উন্নতির জন্য বিশেষজ্ঞরা দশটি সোনালী সূত্রের ওপর জোর দিয়েছেন, যা মূলত অভিভাবক ও পরিচর্যাকারীদের জন্য একটি নির্দেশিকা। এই সূত্রগুলো শুধু চিকিৎসা বা থেরাপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সন্তানের প্রতি আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, প্রাথমিক গ্রহণ (acceptance) এবং আনন্দের মাধ্যমে নিরন্তর সংযোগ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়।

প্রথম তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি
১. আশা রাখুন: অটিজম নিরাময়ের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম সূত্রটি হলো প্রচুর আশা রাখা। সম্প্রতি গবেষণায় অটিজম থেকে আরোগ্যের ঘটনা নিশ্চিত হওয়ায়, কোনো চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের পক্ষ থেকে ‘অটিজম নিরাময়যোগ্য নয়’—এমন কথা বলে অভিভাবকদের নিরুৎসাহিত করা অনুচিত। এই আশাই বাবা-মাকে চিকিৎসার বিভিন্ন পদ্ধতি এবং থেরাপি চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করে।

২. রোগ নির্ণয় দ্রুত গ্রহণ করুন: দ্বিতীয় সূত্রটি হলো রোগ নির্ণয়কে দ্রুততার সাথে গ্রহণ করা। যত দ্রুত এই সমস্যাকে মেনে নেওয়া যায়, তত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব, যা আরোগ্যের সম্ভাবনাকে সরাসরি বাড়িয়ে তোলে। এমনকি মৃদু অটিজমের ক্ষেত্রেও সময় নষ্ট না করে চিকিৎসা শুরু করা অপরিহার্য, কারণ এটি নিজে থেকে সেরে ওঠে না।

৩. হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শুরু করুন: তৃতীয় সোনালী সূত্রটি হলো হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শুরু করা। যদিও সব ক্ষেত্রে এটি কার্যকর নাও হতে পারে, তবে যে-সব শিশু এতে সাড়া দেয়, তাদের জন্য এটি জীবন পরিবর্তনকারী হতে পারে। আরোগ্যের সম্ভাবনা অনেকাংশে নির্ভর করে শিশুর বয়সের ওপর—২-৩ বছর বয়সে চিকিৎসা শুরু করলে সাফল্যের হার বেশি থাকে। তবে বিশেষজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজ থেকে ওষুধ ব্যবহার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

সারাদিন নিরন্তর সংযোগ ও থেরাপির গুরুত্ব
৪. সংযুক্ত রাখুন, সংযুক্ত রাখুন, সংযুক্ত রাখুন: চতুর্থ সূত্র হলো শিশুকে সারাদিন নিরন্তর সংযোগের মধ্যে রাখা। শিশুর সঙ্গে শুধু উপস্থিত থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং সক্রিয়ভাবে তার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। শিশুকে একা ছেড়ে দিলে সে তার নিজস্ব জগতে হারিয়ে যেতে পারে।

৫. থেরাপি কোনো রকেট বিজ্ঞান নয়: থেরাপি বা চিকিৎসার পঞ্চম সূত্রটি হলো এর সরলতা অনুধাবন করা। থেরাপির উদ্দেশ্য হলো শিশুকে তার চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং আনন্দময় খেলার মাধ্যমে এই কাজ করা। ব্যয়বহুল বা জটিল থেরাপির চেয়ে সহজ, মজাদার এবং সক্রিয় অংশগ্রহণমূলক কার্যকলাপ অনেক বেশি কার্যকর। শিশুকে সরাসরি শেখানো বা পড়ানো এড়িয়ে যেতে হবে, কারণ শেখার ৯০-৯৫ শতাংশই ঘটে পরিবেশের সাথে সংযুক্ত থাকার মাধ্যমে নিষ্ক্রিয়ভাবে (passively)।

৬. সংযোগ ও আনন্দ একসাথে: ষষ্ঠ সূত্রটি হলো শিশুকে আনন্দের মাধ্যমে সংযুক্ত রাখা। সংযোগ স্থাপনের সময় শিশুটিকে অবশ্যই খুশি থাকতে হবে, কোনোভাবেই বিরক্ত, হতাশ বা রাগান্বিত করা যাবে না। তার ক্ষমতা বা ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে তাকে সংযুক্ত রাখার চেষ্টা এড়িয়ে চলতে হবে—এতে রাগ, বিরক্তি এবং ট্যানট্রামস (আচরণগত সমস্যা) তৈরি হওয়া রোধ করা যায়।

৭. নেতিবাচক প্রভাব এড়িয়ে চলুন: সপ্তম সূত্রটি হলো ‘নেতিবাচক প্রভাব’ (Negating Effect) এড়ানো। দিনের মাত্র এক-দু’ঘণ্টা থেরাপি দিয়ে বাকি সময় শিশুকে একা ছেড়ে দিলে থেরাপির ইতিবাচক ফল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কষ্টসাধ্য হলেও, শিশুকে সারাদিন সংযুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে, যাতে সে তার নিজস্ব মানসিক জগতে ফিরে যেতে না পারে।

আবেগ নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ও পরিবেশ
৮. শিশুর আবেগ বুঝুন: অষ্টম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটি হলো শিশুর আবেগ ও অনুভূতিগুলো বোঝা। কান্না, রাগ বা অস্থিরতার মতো নেতিবাচক আবেগগুলো শিশুকে তার খোলসের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় এবং তার অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করে। শিশু যদি কোনো নেতিবাচক আবেগ দেখায়, তবে বুঝতে হবে কোনো কিছু তাকে কষ্ট দিচ্ছে। সেই কারণ খুঁজে বের করে দ্রুত তা দূর করতে হবে।

৯. শর্করা (চিনি) নিয়ন্ত্রণ করুন: নবম সূত্রটি হলো শিশুর শর্করার (চিনি) পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা। চিনি গ্রহণে শিশুর অতিরিক্ত হাইপার-অ্যাকটিভিটি (অতিসক্রিয়তা) বেড়ে যেতে পারে, যা তার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায় এবং থেরাপির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।

১০. বাড়িকে থেরাপি সেন্টার বানান: দশম সূত্রটি হলো নিজস্ব বাড়িকে থেরাপি সেন্টারে রূপান্তরিত করা। নিয়মিত স্কুলে শিশুকে পাঠালে দিনের অনেকটা মূল্যবান সময় নষ্ট হয় (স্কুলে যাওয়া-আসা এবং প্রস্তুতির কারণে প্রায় ৮০% সময়)। যদি কোনো স্কুলে এক-থেকে-এক ভিত্তিতে সক্রিয় থেরাপি (যেমন: ABA) এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না যায়, তবে সাধারণ স্কুল এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। এমনকি থেরাপি সেন্টারে যাওয়ার যাতায়াত সময় বেশি হলে বাড়িতেই মজাদার খেলার মাধ্যমে শিশুকে নিরন্তর সংযুক্ত রাখা শ্রেয়।